বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মীর কাসেম আলী ও শাহ আব্দুল হান্নানের অবদান

সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত ক্ষমতায় আসলে অর্থমন্ত্রী কে হবেন সেটি নিয়ে একটি আলাপ উঠেছে। বা তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছে অনেকে। কিন্তু তারা হয়তো জেনেও জানেন না যে ক্ষমতার একদম কেন্দ্রে না থেকেও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ২ জন প্রথিতযশা অর্থনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম যারা বাংলাদেশের অর্থনীতির পালাবদলে, বিশেষ করে সুদবিহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বেসরকারি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বিকাশে নেপথ্যে থেকে অসামান্য নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মীর কাসেম আলী এবং শাহ আব্দুল হান্নান অন্যতম। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সাফল্যের মেরুদণ্ড হিসেবে তাদের কাজ ও দর্শন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এই দুই ব্যক্তিত্ব দুই ভিন্ন অবস্থান থেকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে এবং অন্যজন নীতি-নির্ধারক বা আমলা হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছেন। ক্ষমতার একদম কেন্দ্রে না গিয়ে ও তারা দেশের অর্থনীতির পালাবদলে যেভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন তাঁর প্রভাব ছিল সূদুরপ্রসারী। আজ তাদের দুজনের শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অবদান গুলো নিয়ে কিছু কথা লিখবো।

শাহ আব্দুল হান্নান: অর্থনীতির ধীশক্তি ও নীতি-নির্ধারক

শাহ আব্দুল হান্নান ছিলেন মূলত একজন উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা, যিনি পরবর্তীতে ইসলামী অর্থনীতির তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক গুরু হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তার উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অবদান:

  • ভ্যাট (VAT) ব্যবস্থার প্রবর্তন: ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট (VAT) চালু করার ক্ষেত্রে শাহ আব্দুল হান্নানের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর সাথে মিলে তিনি এই আধুনিক কর ব্যবস্থা প্রবর্তনে কাজ করেন, যা আজ বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস।
  • ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অভিভাবক: তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-এর চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে কেবল পদাধিকারী হিসেবে নয়, বরং ইসলামী ব্যাংকিংকে আইনি ও তাত্ত্বিক কাঠামো দিতে তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চালিয়েছেন। প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের ভিড়ে ইসলামী ব্যাংকিং যে একটি টেকসই এবং লাভজনক মডেল হতে পারে, তা তিনি প্রমাণ করে গেছেন।
  • স্বচ্ছতা ও সততার প্রতীক: আমলাতন্ত্র এবং ব্যাংকিং খাতে তিনি ছিলেন সততার মূর্ত প্রতীক। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর থাকাকালীন তিনি আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
  • অর্থনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা: তিনি কেবল ব্যাংক চালাননি, বরং ‘ইসলামিক ইকোনমিক্স’ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি ও গবেষণা করেছেন, যা পরবর্তী প্রজন্মের ব্যাংকারদের জন্য গাইডলাইন হিসেবে কাজ করেছে।

মীর কাসেম আলী: স্বপ্নদ্রষ্টা উদ্যোক্তা ও সংগঠক

মীর কাসেম আলীকে বলা হয় বাংলাদেশের ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম স্থপতি। তিনি তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে প্রতিষ্ঠান গড়ার দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর জন্ম হয়েছে।

তার উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অবদান:

  • ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ প্রতিষ্ঠা: মীর কাসেম আলী ছিলেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (IBBL)-এর প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান এবং অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলামী ব্যাংকিংয়ের এই সফল মডেল দাঁড় করানোর পেছনে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল অনস্বীকার্য। এর মাধ্যমে তিনি দেশের অর্থনীতিতে বিশাল এক জনগোষ্ঠীর সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তর করেছেন।
  • স্বাস্থ্য খাতের বিপ্লব (ইবনে সিনা ট্রাস্ট): তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল ব্যাংক নয়, সেবামূলক প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘ইবনে সিনা ট্রাস্ট’ আজ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে এক আস্থার নাম। এটি সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।
  • বহুমুখী বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান: কেয়ারি লিমিটেড (আবাসন ও পর্যটন), দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশন এবং এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রির মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে তিনি বেসরকারি খাতের বৈচিত্র্যকরণে ভূমিকা রেখেছেন।
  • রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি: মধ্যপ্রাচ্যের সাথে তাঁর সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনার ব্যবস্থা করেছিলেন, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে।

অর্থনীতিতে এই দুই নেতার অবদানকে একটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বলা যেতে পারে। শাহ আব্দুল হান্নান কাজ করেছেন পলিসি লেভেলে। তিনি আইনি বাধা দূর করেছেন, সরকারকে বুঝিয়েছেন এবং ইসলামী অর্থনীতির দার্শনিক ভিত্তি মজবুত করেছেন। মীর কাসেম আলী কাজ করেছেন ফিল্ড লেভেলে। তিনি মূলধন সংগ্রহ করেছেন, প্রতিষ্ঠান গড়েছেন এবং সেগুলোকে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছেন। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই আজ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দখলে এবং বেসরকারি খাত হয়েছে এতোটা শক্তিশালী।

রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যদি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তবে মীর কাসেম আলী এবং শাহ আব্দুল হান্নান বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে থাকবেন। একটি সুদবিহীন অর্থব্যবস্থা চালু করা এবং বেসরকারি খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো আজও দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখছে। সুতরাং লোক এমনিতেই চলে আসে না। পরিস্থিতি নেতৃত্ব তৈরি করে। জামায়াতে এরকম অনেক ম্যাজিকাল ফিগার ই আছেন। যারা নেপথ্য ই আছেন এখনো। সবার সবসময় সামনে থেকে কাজ করতে হবে এমন কোন কথা নেই। অন্ততপক্ষে একাডেমিক এক্সেলেন্সির দিক দিয়ে জামায়াত কে খাটো করে দেখার কোন উপায় নেই। আর ইকনোমিক্স এ একাডেমিক এক্সিলেন্সি খুব দরকারি।